মুক্তির শর্ত মেনেই দলীয় রাজনীতির খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। কখনো দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের বাসায় ডেকে কথা বলছেন, আবার মোবাইল ফোনে এবং প্রয়োজনে বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে ভিডিও কনফারেন্সও করছেন। এরই মধ্যে গুলশানের বাসায় পৃথকভাবে দলের মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির সদস্য, এক ভাইস চেয়ারম্যান, তার এক আইনজীবী এবং বিশেষ সহকারীকে ডেকে কথা বলেছেন বেগম জিয়া। তাদের মধ্যে কাউকে কাউকে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে বিশেষ নির্দেশনাও দিয়েছেন।
খালেদা জিয়া সক্রিয় হয়ে ওঠায় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অনুসারীরা কিছুটা চিন্তিত এবং বিচলিতও বটে। কারণ তারেক রহমানের হাতে দলের ভার থাকাকালে তাদের যে প্রভাব আছে, তা খর্ব হতে পারে বলে ধারণা করছেন তারা। বেগম জিয়া আবার সক্রিয় হলে তারেক রহমানের বলয়ের নেতা-কর্মী ও অনুসারীদের গুরুত্ব কমে যাবে।
তারেক রহমানের অনুসারী বলে দলে যাদের পরিচিতি আছে, তাদের অধিকাংশই চান না খালেদা জিয়া আবার দলের দায়িত্ব নিক। তারেক রহমানের নেতৃত্বে দল পরিচালনায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন তারা। তবে সম্প্রতি যারা বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন তারা বলছেন, বেগম জিয়া দল সম্পর্কে বেশ খোঁজখবর নিচ্ছেন। দেশের অবস্থা স্বাভাবিক হলে তিনি সক্রিয় হবেন। এখন মোবাইল ফোনে নানা নির্দেশনা দিচ্ছেন।
জোটের অন্যতম শরিক জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাকে ডেকেও কথা বলেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ
পরিস্থিতির কারণে ভার্চুয়াল উপায়ে পর্যায়ক্রমে দলীয় নেতা, দলের বাইরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও কথা বলা শুরু করেছেন।
গত ৭ জুন রবিবার রাতে খালেদা জিয়া টেলিফোনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য রাষ্ট্র বিজ্ঞানী ড. এমাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেছেন। এর আগে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর জন্য ফুল ও ফল পাঠিয়ে টেলিফোনে কুশলও বিনিময় করেছেন খালেদা জিয়া।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. এমাজউদ্দীন আহমদ আমাদের সময়কে বলেন, বেগম জিয়ার সঙ্গে আলোচনা-পরামর্শ করে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা দল পরিচালনা করতে পারেন। তিনি আরও বলেন, নির্বাহী আদেশে ছয় মাসের জন্য বেগম জিয়াকে সরকার মুক্তি দিয়েছে। এই সময়টা গেলে রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারবেন। এখন সময়টা খারাপ। এই মুহূর্তে অন্য কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিও নেই। বিশ্বজুড়ে করোনার সংক্রমণ চলছে। এই অবস্থায় রাজনীতি বলতে আমরা যা বুঝি মিছিল-মিটিং, জনসচেতনতা ইত্যাদি করার সুযোগ নেই।
এদিকে খালেদা জিয়ার এই উদ্যোগে দলের স্থায়ী কমিটি ও নির্বাহী কমিটির বেশিরভাগ সিনিয়র নেতাদের কথায় এক ধরনের স্বস্তির মনোভাব দেখা গেছে। অনেকে বলছেন, অন্তত আরও কিছুদিন দলীয় রাজনীতিটা সম্মানের সাথে করা যাবে। দলের স্থায়ী কমিটি ও ভাইস চেয়ারম্যানদের বড় একটি অংশ খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর দলে গুরুত্বহীন হয়ে পড়েন। হতাশায় তারা দলীয় রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। বেশ কয়েক নেতা পদত্যাগও করেছেন, যারা এখন নতুন করে দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
অন্যদিকে দলীয় নেতাদের সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎসহ অন্য কার্যক্রমে তার পুত্র তারেক রহমানের অনুসারীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাবন্দি হওয়ার পর থেকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দল পরিচালনায় তারেক রহমান সরাসরি ভূমিকা রাখছেন। খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর দলের নীতিনির্ধারণী সব সিদ্ধান্ত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের কাছ থেকেই আসছে। সিদ্ধান্ত তিনি নিজে নিলেও স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডেকে তা অনুমোদন করে নিতেন সব সময়ই। যদিও তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে এ পর্যন্ত কোনো নেতার প্রকাশ্যে দ্বিমতের কথা শোনা যায়নি।
দলীয় বিভিন্ন স্তরের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দলের বেশিরভাগ নেতাকর্মীর একটা ধারণা তৈরি হয়েছিলÑ খালেদা জিয়াকে শেষ পর্যন্ত কারাগারেই থাকতে হবে। এই অবস্থায় তারেক রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা না থাকলে দলীয় রাজনীতিতে পিছিয়ে পড়তে পারেন। এজন্য সিনিয়র অনেক নেতাই তারেক রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে দেন; কিন্তু হঠাৎ করে পরিবারের উদ্যোগে নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে সাজা ছয় মাস স্থগিত করলে ২৫ মার্চ খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয় সরকার।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় বলেন, প্রথম কথা হচ্ছে দলে কোনো অনৈক্য নেই।