কমল গাবতলী হাটের ইজারা মূল্য

প্রতিবেদকের নাম :
  • প্রকাশিত : সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৫ প্রিয় পাঠক,সংবাদটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন এবং মধুমতির সাথেই থাকুন

বাংলা সন ১৪৩৩–এর জন্য রাজধানীর অন্যতম বড় গবাদিপশুর বাজার গাবতলী হাট ইজারা দিতে প্রত্যাশার তুলনায় কম দর পেয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। সরকার নির্ধারিত দর ছিল ১৫ কোটি ৫০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। তবে দরপত্রে বৈধভাবে অংশ নেওয়া একমাত্র দরদাতা এর চেয়ে মাত্র ১২ হাজার টাকা বেশি, অর্থাৎ ১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা প্রস্তাব করেন।

ডিএনসিসি সূত্র জানায়, আগ্রহের ঘাটতি এবং কার্যত প্রতিযোগিতা না থাকায় এ বছর হাটটির ইজারা মূল্য কমে গেছে। একমাত্র বৈধ দরদাতা হিসেবে হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. হানিফকে ইজারা দেওয়ার জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে তাঁকে জামানতের অর্থ জমা দিতে চিঠিও দিয়েছে সিটি করপোরেশন।

গত বছরের তুলনায় এ বছরের দর উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ১৪৩২ বাংলা সনে গাবতলী হাট থেকে মোট আয় হয়েছিল ১৭ কোটি ১৫ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। এর মধ্যে নির্ধারিত সময়ের পরে ইজারা চূড়ান্ত হওয়ায় দর উঠেছিল ১৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা। পাশাপাশি ইজারা দেওয়ার আগে প্রায় দেড় মাস খাস আদায়ের মাধ্যমে করপোরেশন অতিরিক্ত ১ কোটি ৪৪ লাখ ৪৯ হাজার টাকা আয় করেছিল।

এবার দরপত্রপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও যোগসাজশের অভিযোগও উঠেছে। হাটটির দরপত্রের শিডিউল কিনেছিলেন সাতজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। তবে জমা দেন চারজন। তাঁদের মধ্যেও নিয়ম অনুযায়ী বৈধ দর দিয়েছেন মাত্র একজন। বাকি তিনজনের মধ্যে দুজন দর উল্লেখ করলেও ব্যাংকের পে-অর্ডার জমা দেননি, আর একজন দর বা পে-অর্ডার কোনোটিই জমা দেননি।

ডিএনসিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র না হওয়ায় সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অতীতে একাধিক দরদাতা অংশ নেওয়ায় দর উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার নজির রয়েছে। গাবতলী হাট সিটি করপোরেশনের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হওয়ায় এ ধরনের পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রসঙ্গত, গাবতলী গবাদিপশুর হাট বাংলা সনের প্রথম দিন পয়লা বৈশাখ থেকে এক বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। নতুন ইজারা কার্যকর হবে ১৪ এপ্রিল থেকে। সারা বছরই এই হাটে গবাদিপশুর বেচাকেনা চললেও কোরবানির ঈদ কেন্দ্র করে এখানে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে ওঠে।

ঢাকা উত্তর সিটির সম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আগের তিন বছর ইজারাদারদের কাছ থেকে পাওয়া দরের গড় হিসাব করে এই বছরের সরকারি দর নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে গাবতলী হাটের ইজারা মূল্য ছিল ১২ কোটি ২৫ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয়েছিল ১৭ কোটি ১২ লাখ ১৫ হাজার টাকা।

সর্বশেষ গত বছর ১৫ কোটি ৭১ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতাকে। এর সঙ্গে ওই বছর প্রায় দেড় মাস সিটি করপোরেশন নিজেরা খাস আদায়ের মাধ্যমে ১ কোটি ৪৪ লাখ ৪৯ হাজার টাকা আদায় করেছিল। সব মিলিয়ে তিন বছরে মোট আয় দাঁড়ায় ৪৬ কোটি ৫২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। এই হিসাবে গড় ইজারা মূল্য দাঁড়ায় ১৫ কোটি ৫০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা—যেটি এবার সরকারি দর হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

সরকারি দর নির্ধারণেই গত বছরের ইজারা মূল্যের চেয়ে কমে যাওয়ার বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা শওকত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বিধিমালা অনুযায়ী গত তিন বছরের গড় মূল্যকেই সরকারি দর হিসেবে নির্ধারণ করতে হয়। তবে আগে এই গড় মূল্যের সঙ্গে ৫ থেকে ১০ শতাংশ বাড়ানো হতো। ২০২৫ সালের হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) বিধিমালায় সেই সুযোগ রাখা হয়নি।

সম্পত্তি বিভাগের সূত্রে, দ্বিতীয় দফায় দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি। বৈধভাবে সর্বোচ্চ ১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা দর দেওয়া মো. হানিফকেই ইজারার জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে দরদাতাকে জামানতের টাকা জমা দেওয়ার নোটিশও দেওয়া হয়েছে। টাকা জমা দিলে পয়লা বৈশাখের দিনে অর্থাৎ আগামীকাল ১৪ এপ্রিল হাটের দখল নতুন ইজারাদারকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

২০২৬ সালের ইজারার দরপত্রপ্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। খোদ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারাই বলছেন, চারটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিলেও হাট ইজারাপ্রক্রিয়ায় কার্যত কোনো প্রতিযোগিতা হয়নি। কারণ, বৈধভাবে দর দিয়েছেন মাত্র একজন, তিনি মো. হানিফ—১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা, যা সরকারি দরের চেয়ে মাত্র ১১ হাজার ৯৯০ টাকা বেশি।

আগ্রহী দরদাতাদের যোগসাজশের বিষয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর ও স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। জানা যায়, দরপত্রে অংশ নেওয়াদের মধ্যে পারিবারিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। কারও সঙ্গে পারিবারিক আত্মীয়তা রয়েছে আবার কেউ কেউ একই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত।

তাঁদের মধ্যে দরপত্র জমা দেওয়া রাইদ ট্রেডিংয়ের মালিক আশিক ইকরাম। তিনি ওই হাটের সাবেক ইজারাদার লুৎফর রহমানের ছেলে। মো. হানিফ হচ্ছেন আশিকের আপন ফুফাতো ভাই। এ ছাড়া এস এফ করপোরেশনের মালিক শেখ ফরিদ ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক। আর আরেকটি প্রতিষ্ঠান ক্ল্যাসিক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল কাফরুল থানা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক।

দরপত্র জমা দিলেও পে-অর্ডার না দেওয়ার বিষয়ে রাইদ ট্রেডিংয়ের মালিক আশিক ইকরাম প্রথম আলোকে বলেন ‘হানিফ ভাইয়ের সঙ্গে মনে হয় আব্বুর নেগোসিয়েশন হইছে। পরে আমারে ড্রপ করতে মানা করছে। আমি ড্রপ করি নাই।’ হানিফ তাঁর আপন ফুফাতো ভাই বলেও জানান তিনি।

পে-অর্ডার না দিলেও সর্বোচ্চ ২৬ কোটি টাকা দর দিয়েছিলেন ক্ল্যাসিক ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক হাবিবুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ড্রপিং করার জন্য সর্বোচ্চ প্রিপারেশন নিয়ে সবকিছু সেটআপ করা ছিল। রেট তখন লিখে ফেলছিলাম। পে-অর্ডারও কিছু হাতে ছিল। কিন্তু একটা পে-অর্ডার ডিলে হওয়ার কারণে টোটালি ঝামেলায় পড়ে গেছি।’

এ ছাড়া এসএফ করপোরেশনের মালিক শেখ ফরিদ দরপত্র জমা দিলেও কোনো দর দেননি। সেই সঙ্গে কোনো পে-অর্ডারও দাখিল করেননি। একমাত্র বৈধভাবে দরপত্র দাখিল ও পে-অর্ডার জমা দেন হানিফ পরিবহনের মালিক মো. হানিফ। তিনি যোগসাজশের বিষয়টি অস্বীকার করেন। বলেন, দরপত্রের শিডিউলের দাম তিন লাখ টাকা। অনেকেই শিডিউল কেনে মিলেমিশে ধান্দার চিন্তাভাবনা থেকে।

তাঁর কাছেও এমন কিছু প্রস্তাব এসেছিল জানিয়ে মো. হানিফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি কইছি যে ভাই যার যারটা দাও। দুই একজন টেলিফোন করছিল যে ভাই আমরা কিনছি বসি, পার্টনার ব্যবসা করি। না আমি টেন্ডার দিছি আর তোমরা যদি টেন্ডার দাও দিতে পার। আমি মিলামিশে ব্যবসা করি না—এইভাবে আমি বইলা দিছি।’

আশিক ইকরামের (লুৎফরের ছেলে) সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়ে মো. হানিফ বলেন, ‘কিন্তু আমাদের সঙ্গে তাদের ঝামেলা আছে। তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো না।’

Please Share This Post in Your Social Media

মধুমতি টেলিভিশনের অন্যান্য খবর