তৃতীয় স্বামীকে ফাঁসাতে মিথ্যা হত্যা নাটক সাজানোয় স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা

নিউজ ডেস্ক
  • প্রকাশিত : বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২০
  • ৩২২ প্রিয় পাঠক,সংবাদটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন এবং মধুমতির সাথেই থাকুন

তৃতীয় স্বামীকে ফাঁসাতে প্রথম স্বামী হত্যার মিথ্যা নাটক সাজিয়ে আদালতে মামলা দায়ের করেন এক গৃহবধূ। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তৌহিদুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি মারা যান। ঘটনার চার বছর পর মুখে বিষ ঢেলে, গলায় ফাঁস লাগিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে আদালতে মামলা করেন স্ত্রী সুমি খাতুন।

এমনকি পরিচয় গোপন করে সেই মৃত ব্যক্তির ভাই ও বাবাকেও ওই মামলায় আসামি করা হয়েছে। এমন চ্যাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে কুষ্টিয়ার আদালতে।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ৫০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে এসব চ্যাঞ্চল্যকর তথ্য।

মঙ্গলবার বিকালে কুষ্টিয়ার মিরপুর আমলি আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দেলোয়ার হোসেন মিথ্যা হত্যা মামলাটি খারিজের আদেশ দেন। একই সঙ্গে মিথ্যা মামলা দায়ের করায় বাদী সুমি খাতুনের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা দায়েরের আদেশ দেন আদালত। আসামি সুমি খাতুনকে আদালতে হাজির হতে সমন জারি করা হয়েছে।

আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের ২০ নভেম্বর স্বামী তৌহিদুল ইসলামকে হত্যার অভিযোগে চার বছর পর আদালতে মামলা দায়ের করেন স্ত্রী সুমি খাতুন। মামলায় ৩ জনকে আসামি করা হয়। তারা হলেন, জব্বার মোল্লা, সহিদুল ইসলাম ও সেকেন্দার আলী মিস্ত্রি। মামলার এজাহারে মিরপুর উপজেলার পোড়াদহ স্বরুপদহ এলাকার সামছুল মোল্লার মেয়ে সুমি খাতুন দাবি করেন, ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি মিরপুর উপজেলার কচুবাড়িয়া এলাকার তৌহিদুলের সঙ্গে তার পারিবারিকভাবে বিবাহ হয়। বিয়ের আগে থেকে আসামি জব্বার মোল্লা কুপ্রস্তাব দিয়ে উত্ত্যক্ত করে আসছিল। এতে রাজি না হওয়ায় তিনজনের যোগসাজশে বিয়ের পরে আমার স্বামীকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। আর ২০১৫ সালের ২০ নভেম্বর আমার স্বামীর মুখে বিষ ঢেলে গলাই ফাঁস লাগিয়ে হত্যা করা হয়। চার বছর পরে ২০১৯ সালের ২ ডিসেম্বর এমন অভিযোগে তিনজনকে আসামি করে কুষ্টিয়ার মিরপুর আমলি আদালতে মামলা দায়ের করেন সুমি খাতুন। মামলাটি আমলে নিয়ে পিবিআইকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন আদালত।
চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি দায়িত্ব নিয়ে প্রায় দুই মাস তদন্ত করে ২৭ ফেব্রুয়ারি আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন কুষ্টিয়া পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের পুলিশ পরিদর্শক রেজাউল করিম। পিবিআইয়ের ৫০ পৃষ্ঠার ওই তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে সাজানো মামলার নানা চ্যাঞ্চল্যকর তথ্য। পিবিআইর তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, সুমি খাতুন সর্বমোট চারটি বিয়ে করেছেন। তার প্রথম স্বামী তৌহিদুল ইসলাম, দ্বিতীয় স্বামী রকিবুল ইসলাম ওরফে রকি জোয়ার্দ্দার, তৃতীয় স্বামী জব্বার মোল্লা এবং চতুর্থবার পুনরায় বিয়ে করেন দ্বিতীয় স্বামী রকিবুল ইসলামকে।

২০১৫ সালের ২০ নভেম্বর প্রথম স্বামী তৌহিদুল ইসলাম অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। চিকিৎসকের রিপোর্টেও মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করা হয়েছে শ্বাসযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইন্তেকাল করেছেন। প্রথম স্বামীর মৃত্যুর চার মাস পরে ২০১৬ সালের ২৩ মার্চ একই উপজেলার আইলচারা এলাকার রকিবুল ইসলামকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তবে সুমি খাতুনের এ সংসারও বেশি দিন গড়ায়নি। তিন বছরের মাথায় ২০১৯ সালের ১ এপ্রিল দ্বিতীয় স্বামী রকিবুল ইসলামকে তালাক দেন সুমি খাতুন।

আবারো নতুন সংসারের স্বপ্ন দেখেন সুমি। মাত্র আড়াই মাস পর তৃতীয় বিয়ে করেন তিনি। এবার তার নতুন স্বামী মিরপুর উপজেলার পুরাতন আজমপুর এলাকার জব্বার মোল্লা। ২০ জুন তাকে বিয়ে করেন সুমি। বিয়ের পর জব্বার জানতে পারেন সুমি খাতুনের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বেশকিছু টাকা আছে। গ্রামে বাড়ি করার কথা বলে সুমির কাছ থেকে দুটি চেকে স্বাক্ষর করে নেন স্বামী জব্বার। পরে বাড়ি না করায় চেক দুটি ফেরত চান সুমি। এনিয়ে সংসারে শুরু হয় অশান্তি। আবারও মাত্র আড়াই মাসের মাথায় ২ সেপ্টেম্বর তৃতীয় স্বামী জব্বার মোল্লাকেও তালাক দেন সুমি এবং কিছুদিনের মধ্যে দ্বিতীয় স্বামী রকিবুল ইসলামকে চতুর্থবারের মতো বিয়ে করেন। এতে তৃতীয় স্বামী জব্বার মোল্লা চরম ক্ষুব্ধ হন। তার কাছে থাকা চেক দুটি ব্যাংক থেকে ডিজঅনার করে ২০১৯ সালের ৯ অক্টোবর ও ১৮ অক্টোবর মিরপুর আদালতে সুমি খাতুনের বিরুদ্ধে ১০ ও ৩০ লাখ টাকার দুটি সিআর মামলা দায়ের করেন। মামলার বিষয়টি জানার পর সুমি খাতুন তার সাবেক স্বামী জব্বার মোল্লা ওপর চরম ক্ষুব্ধ হন। এ ঘটনার প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেন তিনি। অসুখে প্রথম স্বামী তৌহিদুলের মৃত্যুকে হত্যার নাটক সাজিয়ে তৃতীয় স্বামী জব্বার মোল্লাকে ফাঁসানোর কৌশল আঁটেন সুমি। চার বছর পর ২০১৯ সালের ২ ডিসেম্বর জব্বার মোল্লা ছাড়াও মৃত স্বামীর ভাই ও বাবার পরিচয় গোপন করে তাদের তিনজনের বিরুদ্ধে কুষ্টিয়ার মিরপুর আমলি আদালতে মামলা দায়ের করেন সুমি খাতুন।

পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে এমন চ্যাঞ্চল্যকর তথ্য দেখে হতবাক হয়ে যান খোদ আদালতের বিচারক।

সোমবার বিকালে মামলার আদেশের পর্যালোচনায় আদালত বলেন, মামলা দায়েরের পর অভিযোগকারী আদালতে হাজির হয়নি। মামলার তদন্ত প্রতিবেদন, সাক্ষীদের ১৬১ ধারার জবানবন্দি ও অন্যান্য কাগজপত্র পর্যালোচনা এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, কোন সাক্ষী অভিযোগকারীর দরখাস্ত সমর্থন করেন নাই। তাছাড়া চিকিৎসকের মতামত এই মামলার ভিকটিমের মৃত্যু হয়েছে শ্বাসযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে। অতএব মামলাটি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৮৯৮-এর ২০৩ ধারায় খারিজের আদেশ করা হলো।

একই সাথে হত্যার নাটক সাজিয়ে মিথ্যা মামলা দায়ের করায় বাদি সুমি খাতুনের বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ১৮৬০ এর ২১১ ধারায় নতুন করে মামলা করার নির্দেশ দেন। আসামি সুমি খাতুনের আদালতে হাজির হতে সমন জারি করা হয়েছে।

বাদির আইনজীবী নজরুল ইসলাম বলেন, ২০১৯ সালের শেষের দিকে আমার মক্কেল সুমি খাতুন নিজের স্বামী হত্যার অভিযোগ এনে তিনজনকে আসামি করে মামলাটি দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পিবিআইকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। তবে মামলাটি করার পর বাদী আমার সঙ্গে আর যোগাযোগ করেননি। আমিই মাঝে একদিন যোগাযোগ করে মামলার বিষয়টি বলেছি। সে আমাকে জানিয়েছিল আমাদের মধ্যে আপস-মীমাংসা হয়ে গেছে।

Please Share This Post in Your Social Media

মধুমতি টেলিভিশনের অন্যান্য খবর