মেজবাহ উদ্দিন সরকার রুবেল (৪৪)। টঙ্গী বাজারের সরকার পরিবারের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে গাজীপুর সিটি করপোরেশনে মেয়র নির্বাচনে পরাজিত। থাকেন উত্তরা পশ্চিম থানাধীন ৭ নম্বর সেক্টর এলাকায়। নিজের নিরাপত্তার জন্য ২০২০ সালে গাজীপুর থেকে লাইসেন্স নিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল কিনেছেন। নিজের নিরাপত্তার জন্য অস্ত্রটি কিনলেও সেটির অপব্যবহার করে এলাকায় ভয়ভীতি দেখিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন তিনি।
শুধু তাই নয়, ওই সময় রুবেলের সঙ্গে আরও তিনজন নিরাপত্তারক্ষী থাকত। তাদের হাতে থাকত তিনটি শটগান। ওই তিন নিরাপত্তারক্ষীও নিজেদের লাইসেন্স করা পিস্তল নিয়ে এলাকায় মহড়া দিয়ে সেই ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে। সেই পোস্টকে কেন্দ্র করে ২০২১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে মেজবাহ উদ্দিন রুবেলকে উত্তরার বাসা থেকে গ্রেফতার করে র্যাব। তবে রুবেলের অস্ত্রটি উদ্ধার করা হলেও শটগান তিনটি উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নিরাপত্তারক্ষীদের একজনের নাম মো. ফারুক। অন্য দুজনের নাম জানা যায়নি। দেশে বৈধ অস্ত্রের আড়ালে এমনভাবে অবৈধ ব্যবহার বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অস্ত্রের ব্যবহারে নীতিমালা থাকলেও তার তোয়াক্কাও করছেন না অনেক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী।
শুধু পাড়া-মহল্লায় নয়, আদালতের এজলাসেও একাধিক মামলার আসামি অস্ত্রসহ হাজিরা দিতে গিয়ে গ্রেফতার হয়েছে। সম্প্রতি গাজীপুর আদালতে মনসুর আহমেদ নামে এক সন্ত্রাসী এজলাসে বিদেশি পিস্তলসহ গ্রেফতারের পর তোলপাড় সৃষ্টি হয়। মনসুরের বিরুদ্ধে ফৌজদারিসহ একাধিক মামলা থাকলেও অস্ত্রের লাইসেন্স কীভাবে পেল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, ফৌজদারি মামলার আসামি অস্ত্রের লাইসেন্স পাবে না।
সম্প্রতি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে যুবলীগের আহ্বায়ক ও শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহজালাল মজুমদারের ওপর কথিত যুবলীগ নেতা মনিরুজ্জামান জুয়েলের নেতৃত্বে এক দল সন্ত্রাসী অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। হামলায় চেয়ারম্যানের গাড়িচালক আমজাদ হোসেন আহত হন। ওই ঘটনার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ওই ঘটনায় এখন জুয়েলকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বৈধ অস্ত্র অবৈধভাবে ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে আইনে। তবুও আইন অমান্য করে একের পর এক ঘটনা ঘটিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে সন্ত্রাসীরা। এদিকে অস্ত্র কেনা ও পুরনো অস্ত্রের লাইসেন্স নবায়নে আইনি জটিলতার কারণে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে বলে মনে করেন অস্ত্র ব্যবসায়ীরা।
পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) হালনাগাদ বৈধ অস্ত্রের তথ্যভান্ডার ফায়ার আর্মস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফএএমএস) সূত্র মতে, দেশে গত বছরের জুলাই থেকে ছয় শতাধিক থানা এলাকার লাইসেন্স করা অস্ত্র এবং এর ব্যবহারকারীদের তথ্যভান্ডারে যুক্ত করা হয়। গত ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ৪৪ হাজার ১০৪টি অস্ত্রের লাইসেন্সের তথ্য এতে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ হাজার ৭৭৭টি অস্ত্রের লাইসেন্স রয়েছে ব্যক্তির নামে। বাকি ৩ হাজার ৩২৭টি অস্ত্র রয়েছে আর্থিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে। এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছেÑ একনলা ও দোনলা বন্দুক, শটগান, পিস্তল, রিভলবার ও রাইফেল।
এসব অস্ত্রের লাইসেন্স নেওয়ার তালিকায় রয়েছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। একজনের নামে একাধিক অস্ত্রের লাইসেন্সও আছে। বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি অস্ত্রের লাইসেন্স রয়েছে ঢাকা বিভাগেÑ ১১ হাজার ৮৯৮টি, সবচেয়ে কম বরিশালেÑ ২ হাজার ২৪৮টি।
সারা দেশে লাইসেন্স করা অস্ত্র হারানো, থানায় জমা দেওয়া, লাইসেন্স করা অস্ত্রের বিষয়ে পুলিশের পরিদর্শন ও অস্ত্র খোয়া যাওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানাগুলোতে ৮৪টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। ২৪টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স স্থায়ী বাতিল করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আখতার হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, বৈধ অস্ত্রের অবৈধভাবে ব্যবহার করা হলে তার লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল হবে। অবৈধ ব্যবহারকারীদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহারের নীতিমালার বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়টি আজ বিস্তারিত বলা যাবে।
গাজীপুর জেলা অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্র্রেট (এডিএম) অঞ্জন কুমার সরকার সময়ের আলোকে বলেন, এখন পর্যন্ত ছয় শতাধিক অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে লাইসেন্স নবায়ন না করা, অবৈধভাবে অস্ত্র প্রদর্শন ও বিগত ৫-৬ বছর ধরে সঠিকভাবে কাগজপত্র প্রদর্শন না করায় এসব লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।
সম্প্রতি গাজীপুরে আদালতে মনসুর আহমেদ অস্ত্রসহ গ্রেফতার ও উত্তরায় মেজবাহ উদ্দিন সরকার অস্ত্রসহ গ্রেফতার হওয়ার পর সেই লাইসেন্স ভবিষ্যতে পেতে পারেন কি না প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যারা অস্ত্রের লাইসেন্স নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে এবং অবৈধভাবে প্রদর্শন করেছে তাদের লাইসেন্স ফেরত পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তিনি বলেন, আরও অনেক লাইসেন্স বাতিল প্রক্রিয়াধীন বলে জানান তিনি।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, লাইসেন্স করা অস্ত্র ব্যবহারেরও বিভিন্ন নিয়ম রয়েছে। এর মধ্যে বিনা কারণে অহেতুক কাউকে হুমকি বা ভয় দেখানোর জন্য এসব অস্ত্র প্রদর্শন করতে পারবে না। কারও কাছে অস্ত্র থাকলে তিনি সেটিকে গোপনে রাখবেন। কখনও নিরাপত্তার শঙ্কা দেখা দিলে প্রদর্শন করতে পারবেন। আবার ওই ব্যক্তি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ভ্রমণের সময়ও অস্ত্রটি খুবই সতর্কতার সঙ্গে গোপনে বহন করবেন। চাইলেই কাউকে দেখিয়ে ভয় দেখানো বা প্রদর্শন করে আতঙ্ক তৈরি করা যাবে না। বাসা-বাড়িতেও ব্যবহারের ক্ষেত্রে এমন বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
লাইসেন্স পাওয়া এবং ব্যবহারের যেসব নিয়ম : সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশে ছোট-বড় যেকোনো ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র কিনতে হলে সরকারের অনুমতি নিতে হয়, অর্থাৎ অস্ত্র কেনার জন্য আগে লাইসেন্স করতে হয়। এ সংক্রান্ত নিয়মগুলো কয়েকটি আইনের আওতায় পরিচালিত হয়। এর মধ্যে মূলত ১৮৭৮ সালের আর্মস অ্যাক্ট এবং ১৯২৪ সালের আর্মস রুলস আইনের আওতায় যেকোনো সামরিক বা বেসামরিক নাগরিককে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার জন্য কিছু মানদণ্ড রয়েছে, সেগুলো পূরণ হলেই একজন নাগরিক আবেদন করতে পারবেন। আবেদনকারীর জীবনের বাস্তব ঝুঁকি থাকলে তিনি আবেদন করতে পারবেন ‘শর্ট ব্যারেল’ আগ্নেয়াস্ত্রের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর বয়স ন্যূনতম ৩০ বছর, ‘লং ব্যারেল’ আগ্নেয়াস্ত্রের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ২৫ বছর হতে হবে, ৭০ বছরের নিচে হবে বয়স। আবেদনকারীকে অবশ্যই আয়করদাতা হতে হবে, বছরে ন্যূনতম ৩ লাখ টাকা আয়কর দিতে হবে। অনুমতি পেলে আবেদনকারী অস্ত্র আমদানি করে আনতে পারেন অথবা দেশীয় বৈধ কোনো ডিলারের কাছ থেকে অস্ত্র কিনতে পারবেন। কোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুটি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্সের ক্ষেত্রে একজন নাগরিককে তার স্থায়ী ঠিকানায় উল্লিখিত জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে লাইসেন্স ও আগ্নেয়াস্ত্র বিভাগ থেকে আবেদনপত্র সংগ্রহ করতে হবে। এক্ষেত্রে এসবি শাখা তদন্ত করে আবেদনকারীর তথ্য মিলিয়ে দেখে একটি রিপোর্ট দেয়। এরপর জেলা প্রশাসক বা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমোদনের পর সেটি পাঠানো হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনাপত্তিপত্র দিলে জেলা প্রশাসক ওই আবেদনকারীর বরাবরে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ইস্যু করেন। এক্ষেত্রে আবেদনপত্রের সঙ্গে বৈধ নাগরিকত্বের সনদপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, ট্যাক্স সার্টিফিকেটের ফটোকপি, ছয় কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি এবং লাইসেন্স ফি জমা দিতে হবে।
অস্ত্র ব্যবহারের নিয়ম : আগ্নেয়াস্ত্র বিষয়ে সর্বশেষ ‘আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা ২০১৬’ আইনে কেবল আত্মরক্ষার স্বার্থে ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। তবে এই আইনে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান সাধারণভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। আগ্নেয়াস্ত্রের মালিক কখন ‘টেস্ট ফায়ার’ বা পরীক্ষামূলকভাবে ফাঁকা গুলি চালাতে পারবেন, সে সংক্রান্ত কিছু নিয়ম আছে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ‘টেস্ট ফায়ার’ করা যাবে না। নতুন কেনা অস্ত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে আগ্নেয়াস্ত্রের মালিক ‘টেস্ট ফায়ার’ করতে পারবে। এ ছাড়া পুরনো অস্ত্র বছর শেষে বার্ষিক নবায়ন করতে গেলে তখন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়ম অনুযায়ী ‘টেস্ট ফায়ার’ করা হয় অস্ত্রের কার্যকারিতা প্রমাণের জন্য। গুলি সংগ্রহের ক্ষেত্রেও জেলা প্রশাসকের অনুমতি লাগে এবং গুলির হিসাব সংশ্লিষ্ট থানা ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়কে জানাতে হয়। গুলি সংগ্রহের বাৎসরিক সীমা বা পরিমাণ লাইসেন্সে নির্ধারিত থাকে। এ ছাড়া আগ্নেয়াস্ত্র যিনি ব্যবহার করবেন লাইসেন্সটি তার নামে থাকতে হবে। যেমন : মালিক যদি ব্যবহার করেন তার নামে লাইসেন্স থাকতে হবে। আবার কোনো ক্ষেত্রে যদি আগ্নেয়াস্ত্রটি মালিকের দেহরক্ষী ব্যবহার করেন তা হলে তার নামে লাইসেন্স থাকতে হবে। আগ্নেয়াস্ত্র হারিয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে থানায় জিডি বা সাধারণ ডায়েরি করতে হবে। মালিক দেশের বাইরে গেলে, আগ্নেয়াস্ত্রের নিরাপত্তার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট থানাকে জানিয়ে যেতে হবে। যেকোনো নির্বাচনের আগে আগ্নেয়াস্ত্র স্থানীয় পুলিশের কাছে জমা দিতে হবে। এক বছর পরপর আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নবায়ন করতে হয়।
বাংলাদেশ আর্মস ডিলার অ্যান্ড ইমপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নাসির আহমেদ সময়ের আলোকে জানান, ২০১৬ সালে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারে যে আইন পাস করা হয়েছে, সেই আইনের কারণে অস্ত্র কিনতে আগ্রহ হারিয়েছে ক্রেতারা। আগে প্রতিবছর লাইসেন্স নবায়ন করতে ১ হাজার টাকা লাগত। নতুন আইনে ২০ হাজার টাকা লাগে। আগে গুলি কিনতে থানাকে অবহিত করলেই চলত, এখন জিডি করে জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে অনুমোদন নিয়ে কিনতে হয়। এ ছাড়াও নানা ঝক্কিঝামেলার জন্য মানুষ অস্ত্র কিনতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। ফলে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে।